
বিএনপি’র কোলে আওয়ামী লীগের বসবাস
বাড্ডা-আফতাবনগর এলাকায় প্রশাসনের নীরবতায় জনমনে প্রশ্ন
স্টাফ রিপোটার তুহিন হোসেন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন (১)
ঢাকা মহানগরের বাড্ডা ও আফতাবনগর এলাকায় সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, অস্বচ্ছ আর্থিক উত্থান, এলাকায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগে একটি নাম বারবার ঘুরে আসছে—এস এম কামাল। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের নীরবতা জনমনে আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অভিযোগ ১: শত কোটি টাকার মালিকানা—আয়ের উৎস কোথায়?
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সিটি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এস এম কামাল বর্তমানে প্রায় শত কোটি টাকার মালিক।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, তার ঘোষিত আয়–উৎস ও সম্পদের পরিমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে। ঠিক কীভাবে এই সম্পদ অর্জিত হলো—এ প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর তারা এখনো পাননি। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি দ্রুত অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন।
অভিযোগ ২: আফতাবনগরের উন্নয়ন স্থবির রেখে মসজিদে অনুদান দিয়ে প্রভাব বিস্তার
বাসিন্দাদের দাবি, সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় আফতাবনগরের কোনো বড় উন্নয়নমূলক কাজ না করেও কামাল বিভিন্ন মসজিদে এয়ারকন্ডিশনার ও অনুদান দিয়ে প্রভাব বাড়ান এবং সংগঠনে নানা পদ দখল করেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ—এ ধরনের দান-অনুদানকে উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিযোগ ৩: ৫ আগস্ট ২০২৫–এর ঘটনার পর্দার আড়ালে থাকার অভিযোগ
৫ আগস্ট ২০২৫–এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কামাল প্রকাশ্যে না এসে “ছাত্রদের ওপর হামলা ও নিপীড়নের অর্থায়নে ভূমিকা রেখেছেন”—এমন অভিযোগ কিছু শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে পাওয়া গেছে।
তবে তার ব্যক্তিগতভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করার কোনো বিবৃতি এখনো পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ ৪: কাইয়ুমের নাম ভাঙানো ও বিএনপি নেতার মার্কেটে বিপুল অর্থ ব্যয়
ঢাকা উত্তরের সমাজসেবক ও রাজনীতিক কাইয়ুম সাহেবের নাম ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও উঠেছে কামালের বিরুদ্ধে।
এছাড়া গুলশান ডিওএইচএস মার্কেট—যার সভাপতি একজন বিএনপি নেতা—সেখানে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে কামাল বর্তমানে নিজ বাসায় অবস্থান করছেন বলে এলাকাবাসীর দাবি।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বাড্ডা থানার “শেখ হাসিনা মামলা (পার্টনার ১০ নম্বর)”–এ আসামি থাকা সত্ত্বেও তিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন।
অভিযোগ ৫: আফতাবনগরে অনিরাপদ পরিবেশ—বেপরোয়া রেস্টুরেন্ট-ফাস্টফুড-‘ক্লাব’ সংস্কৃতি
প্রতিদিন উশৃঙ্খল নারী-পুরুষের আড্ডা, অনিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্ট–ফাস্টফুড, লাউঞ্জ ও ছোট-বড় ক্লাব গড়ে ওঠায় পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বহু বাসিন্দা।
রাতের দিকে শব্দদূষণ, অপ্রীতিকর আচরণ ও সামাজিক অবক্ষয়ের অভিযোগও এসেছে।
অভিযোগ ৬: ছিনতাই–ধর্ষণ–উশৃঙ্খলতা—নিরাপত্তাহীনতা চরমে
আফতাবনগরের শুরু থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ছিনতাই, যৌন সহিংসতা, রাতের বেলায় উশৃঙ্খলতার কারণে নিরাপত্তাহীনতা তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাসিন্দাদের দাবি, পরিষদের সভাপতি আলমগীর ঢালী ও এস এম কামালের তত্ত্বাবধানে থাকা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বাস্তব কার্যকারিতা নেই।
অভিযোগ ৭: আবারও নেতৃত্ব দখলের প্রস্তুতি ও বিএনপি থেকে কমিশনার পদে মনোনয়ন নেওয়ার আলোচনা
কামালের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বরাতে স্থানীয় কিছু সূত্র জানিয়েছে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবশালী মহলকে অর্থ–উপঢৌকন দিয়ে আবারও সভাপতি–সেক্রেটারি পদে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হওয়ার চেষ্টা করছেন।
এমনকি বিএনপি থেকে কমিশনার পদেও মনোনয়ন নেওয়ার কথাও আলোচনায় রয়েছে বলে দাবি তাদের।
অভিযোগ ৮: বিদেশযাত্রা ও অর্থপাচারের সন্দেহ—দুদকের হস্তক্ষেপ দাবি এলাকাবাসীর
বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্তানদের দেখতে ঘন ঘন কানাডা যাওয়া কি কেবলই পারিবারিক প্রয়োজন, নাকি এর আড়ালে অর্থপাচার হচ্ছে—এ প্রশ্ন এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
তাদের দাবি, থানা–প্রশাসন নয়, দুদকের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
প্রশাসনের নীরবতা—জনমনে প্রশ্ন
এতসব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের প্রশ্ন
আওয়ামী লীগের পরিচয়ে রাজনীতি করলেও বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কেন? আর কেনই বা কর্তৃপক্ষ নীরব
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
এই অভিযোগগুলো সম্পর্কে এস এম কামালের বক্তব্য পাওয়ার জন্য তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আলমগীর ঢালীরও আনুষ্ঠানিক মতামত পাওয়া যায়নি।
দুদক ও পুলিশ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হনন
শেষ কথা
বাড্ডা–আফতাবনগরবাসীর দাব এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সন্দেহজনক সম্পদ গঠন ও রাজনৈতিক অস্পষ্টতা নিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।
তাদের ভাষায়—
“দেশের আইন সবার জন্য সমান হলে একজনের বিচার হলে আরেকজন ছাড়া পাবে কেন?”
আগামী পর্বে চোখ রাখুন